চাঁদাবাজির মামলায় গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম কলেজের শিক্ষার্থী ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী তাহরিমা জামান সুরভী টানা ১০ দিন ধরে কারাগারে রয়েছেন। স্থানীয় সাংবাদিক নাঈমুর রহমান দুর্জয় নিজেকে ভুক্তভোগী দাবি করে তার বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেন। মামলার পরপরই পুলিশের বরাতে কিছু সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়, জুলাই আন্দোলনে গাজীপুরে নেতৃত্ব দেওয়া ওই শিক্ষার্থী ৫০ কোটি টাকা চাঁদাবাজি করেছেন। তবে মামলার নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এজাহারে অভিযোগের অঙ্ক ৫০ কোটি নয়, বরং ৫০ হাজার টাকা।
মামলার বাদি নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের বিরুদ্ধে সুরভীকে কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক মঈনুল ইসলাম দাবি করেন, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের কথা বলে দুর্জয় সুরভীর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তিনি কুপ্রস্তাব দেন বলে অভিযোগ করা হয়। সুরভী তা প্রত্যাখ্যান করায় তাকে চাঁদাবাজির মামলায় ফাঁসানো হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে।
পুলিশ এখনো মামলার চার্জশিট দাখিল করতে পারেনি। আগামীকাল আদালতে মামলার শুনানি রয়েছে। সেখানে পুলিশের পক্ষ থেকে রিমান্ড আবেদন করা হতে পারে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
এর আগে গত ২৫ ডিসেম্বর গাজীপুরের নিজ বাসা থেকে তাহরিমা জামান সুরভীকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর পুলিশ সূত্রের বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গুলশানের এক ব্যবসায়ীকে জুলাই আন্দোলনসংক্রান্ত মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র আড়াই কোটি টাকা আদায় করে এবং ওই চক্র ইতোমধ্যে ব্ল্যাকমেইল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রায় ৫০ কোটি টাকা তুলেছে। এসব প্রতিবেদনে সুরভীকেই চক্রের মূল নেতৃত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তবে মামলার এজাহার বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব দাবির সঙ্গে মামলার বিবরণের মিল নেই। ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানায় মামলাটি দায়ের করা হয়। দণ্ডবিধির ৩৪২, ৩২৩, ৩৮৫, ৩৮৬, ৫৩৭৯ ও ৫০৬ ধারায় মামলাটি রুজু করা হয়।
এজাহারে বাদি নাঈমুর রহমান দুর্জয় উল্লেখ করেন, ১৮ নভেম্বর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সুরভী তাকে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়ার কথা বলে গাজীপুর চৌরাস্তা এলাকায় আসতে বলেন। পরে বিভিন্ন স্থানে ঘোরানোর পর কালিয়াকৈরের সফিপুর বাজারসংলগ্ন এলাকায় তাকে মোটরসাইকেল থামাতে বাধ্য করা হয়। সেখানে আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা কয়েকজনের সহযোগিতায় তার মোটরসাইকেল, চাবি ও একটি স্মার্টফোন নিয়ে নেওয়া হয়।
এজাহারে আরও বলা হয়, তাকে মারধর করে ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে একটি বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন চালানো হয়। মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে আত্মীয়দের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা আনতে বলা হয়। পরে বিকাশের মাধ্যমে ৪৪ হাজার ৭০০ টাকা এবং নগদ ৪ হাজার ৫৭০ টাকা নেওয়া হয়। পরদিন বিকেলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হলেও ঘটনার বিষয়ে মুখ খুললে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। পরে তার মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন ফেরত দেওয়া হয়।
মামলার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দাবি করা পাঁচ লাখ টাকার পরিবর্তে মোট আদায়কৃত অর্থ ছিল ৪৯ হাজার ২৭০ টাকা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার নাসির উদ্দিন বলেন, ৫০ কোটি টাকার তথ্য গণমাধ্যমে ছড়িয়েছে, পুলিশ এ ধরনের কোনো তথ্য দেয়নি। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে সুরভীর সঙ্গে দুর্জয়ের কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ১৪ সেকেন্ডের ওই অডিওতে কক্সবাজার ভ্রমণ ও একসঙ্গে সময় কাটানোর ইচ্ছা প্রকাশ করতে শোনা যায় দুর্জয়কে। সুরভীর পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এই কথোপকথন তার বিরুদ্ধে আনা কুপ্রস্তাবের অভিযোগকে সমর্থন করে।
নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগও রয়েছে। গত বছরের ৪ আগস্ট তিনি জুলাই অভ্যুত্থানে সাহসী ভূমিকার জন্য সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের পুরস্কার গ্রহণ করেন এবং নিজেকে দেশ টিভির সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেন। সে সময় তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার ছিলেন। সুরভী সংক্রান্ত ঘটনায় গত নভেম্বরে তাকে বাংলাদেশ প্রতিদিন থেকে বাদ দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি কালবেলায় কর্মরত রয়েছেন।
সুরভীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট রাশেদ খান জানান, মামলায় এখনো কোনো জব্দ তালিকা বা চার্জশিট নেই। আগের শুনানিতে সুরভীর জামিন নামঞ্জুর হয়েছে। আগামী শুনানিতে রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।