শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

দুর্গম এলাকায় পৌঁছাচ্ছে না ত্রাণ, দাফনেও চরম সংকট

টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং নদ-নদীর পানি বৃদ্ধিতে চট্টগ্রাম জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে। সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীসহ বিভিন্ন উপজেলার লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কোথাও কোথাও কবরস্থান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় লাশ দাফনেও দেখা দিয়েছে চরম সংকট। প্রশাসন, সেনাবাহিনী, অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার বাহিনী, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ চললেও দুর্গত মানুষের অভিযোগ, অধিকাংশ সহায়তা মূল সড়ক ও সহজে পৌঁছানো যায় এমন আশ্রয়কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ থাকছে। ফলে দুর্গম গ্রামের বহু পরিবার এখনো খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে দিন কাটাচ্ছে।

A
Admin
২৫ জুলাই, ২০২৬
টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং নদ-নদীর পানি বৃদ্ধিতে চট্টগ্রাম জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে। সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীসহ বিভিন্ন উপজেলার লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কোথাও কোথাও কবরস্থান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় লাশ দাফনেও দেখা দিয়েছে চরম সংকট। প্রশাসন, সেনাবাহিনী, অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার বাহিনী, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ চললেও দুর্গত মানুষের অভিযোগ, অধিকাংশ সহায়তা মূল সড়ক ও সহজে পৌঁছানো যায় এমন আশ্রয়কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ থাকছে। ফলে দুর্গম গ্রামের বহু পরিবার এখনো খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে দিন কাটাচ্ছে।

ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, বিভিন্ন জেলা থেকে ত্রাণবাহী যানবাহন এলেও নৌকার স্বল্পতা, তীব্র স্রোত, ভাঙা সড়ক এবং দুর্গম এলাকার পথ না চেনার কারণে অধিকাংশ স্বেচ্ছাসেবক উপজেলা সদর কিংবা প্রধান সড়কের বাইরে যেতে পারছেন না। এতে সড়কসংলগ্ন এলাকার অনেকে একাধিকবার ত্রাণ পেলেও বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোর অসংখ্য পরিবার এখনো কোনো সহায়তা পায়নি।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রোববার সকাল পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৬ লাখ ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি ছিলেন। বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ২২ হাজার ১০০ জন। এ দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন ১৩ জন।

সাতকানিয়ার কাঞ্চনা, ছদাহা, এওচিয়া, কেঁওচিয়া ও চরতি ইউনিয়নসহ পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় বুক থেকে গলা সমান পানি জমে রয়েছে। বহু ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় বাসিন্দারা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও বের করতে পারেননি। তাদের অভিযোগ, কয়েক দিন ধরে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের অপেক্ষায় থাকলেও পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছেনি।

দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান বলেন, দলের পক্ষ থেকে সব গ্রামে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এবং অনেক এলাকা পৌরসভা থেকে দূরে হওয়ায় কিছু স্থানে সহায়তা পৌঁছাতে সময় লাগছে। তিনি জানান, ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই ত্রাণ বিতরণ করায় একই ব্যক্তি একাধিকবার সহায়তা পাচ্ছেন, আবার দুর্গম এলাকার মানুষ বঞ্চিত থাকছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সরকারি ও বেসরকারি ত্রাণ পৌঁছে দিতে সমন্বয়ের চেষ্টা চলছে।

লোহাগাড়ার পদুয়া, চরম্বা ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের প্লাবিত গ্রামগুলো থেকেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রধান সড়কে ত্রাণ কার্যক্রম দৃশ্যমান হলেও ভেতরের পাড়া-মহল্লার বহু পরিবার এখনো পানিবন্দি। শিশুদের জন্য দুধ, শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট সেখানে প্রকট আকার ধারণ করেছে।

চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল, বৈলতলী ও হাশিমপুর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারাও জানিয়েছেন, নৌযানের সংকটের কারণে ত্রাণ পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে।

বাঁশখালীর ছোট ছনুয়া, জালিয়াঘাটা, ইলশা, সরল হারুনের পশ্চিমপাড়া, মিঞ্জিলতলা, খালাইচ্ছার দোকানসংলগ্ন এলাকা এবং পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি গ্রামের মানুষও এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ পাননি। অনেকের হাতে সহায়তা পৌঁছালেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

বাঁশখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, এখন পর্যন্ত ১০০ টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে এবং তা নিয়ম অনুযায়ী বিতরণ করা হচ্ছে। তবে বন্যাকবলিত মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় একসঙ্গে সবাইকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিনি জানান, বাইরে থেকে আসা ত্রাণ দুর্গম এলাকায় পৌঁছে দিতে বিভিন্ন ইউনিয়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তাদের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হবে।

বাঁশখালীর বাসিন্দা আকিব বলেন, বিভিন্ন জেলা থেকে বহু মানুষ ত্রাণ নিয়ে এলেও বেশির ভাগ সহায়তা সড়কের পাশের গ্রামেই বিতরণ হচ্ছে। ফলে একই ব্যক্তি একাধিকবার ত্রাণ পাচ্ছেন, অথচ ভেতরের গ্রামের মানুষ এখনো অনাহারে রয়েছেন। তিনি আরও বলেন, অধিকাংশ নলকূপ বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এতে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ ব্যক্তি ও গর্ভবতী নারীরা।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘স্বপ্নযাত্রী’র কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রুবেল মাহমুদ বলেন, অনেক সংগঠন মহাসড়কসংলগ্ন এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করেই ফিরে যাচ্ছে। দুর্গম এলাকায় যেতে না পারা, স্থানীয় পথঘাট সম্পর্কে ধারণা না থাকা এবং নৌকার সংকটের কারণে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, নৌকার মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সেনাবাহিনী, অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার বাহিনী এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সমন্বয়ে যেসব এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত সহায়তা পৌঁছেনি, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এদিকে বন্যার পানিতে সাতকানিয়ার বহু পারিবারিক কবরস্থান তলিয়ে যাওয়ায় দাফনকার্যেও চরম দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। ঘরবাড়ি, উঠান ও কবরস্থান পানির নিচে চলে যাওয়ায় স্বজনদের অনেক দূরে নিয়ে লাশের গোসল, জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করতে হচ্ছে।

সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ ফোরকান গত শুক্রবার বিকেলে মারা যান। কিন্তু তার বাড়ি ও পারিবারিক কবরস্থান কোমরসমান পানিতে তলিয়ে থাকায় সেখানে দাফন সম্ভব হয়নি। স্বজনরা জানান, মরদেহ প্রথমে ভেলায় করে প্রায় তিনশ মিটার দূরের শুকনো স্থানে নেওয়া হয়। পরে অটোরিকশাযোগে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের দস্তিদারহাট এলাকায় লাশের গোসল, কাফন ও জানাজা সম্পন্ন করা হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানের পরিবর্তে পাশের একটি সরকারি খাসজমির পাহাড়ে তাকে দাফন করা হয়।

ফোরকানের ছেলে রাসেল উদ্দিন বলেন, পরিবারের সবাইকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তার বাবারও শেষ ইচ্ছা ছিল সেখানেই সমাহিত হওয়ার। কিন্তু বন্যার কারণে সেই ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব হয়নি।

কেঁওচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহসিন বলেন, ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা এখনো পানির নিচে রয়েছে। ফোরকানের বাড়ি, চলাচলের পথ ও পারিবারিক কবরস্থান প্লাবিত থাকায় মরদেহ ভেলায় করে শুকনো স্থানে নিয়ে গিয়ে দাফনের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, এই ঘটনা সাতকানিয়ার বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহতার একটি মর্মস্পর্শী চিত্র। সূত্র: দেশ রুপান্তর

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

শিরোনাম:
সদ্য. রাকসু জিএস আম্মারসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের সদ্য. লতিফ সিদ্দিকীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ ট্রাইব্যুনালের সদ্য. মানবপাচার ও অনলাইন স্ক্যাম প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সদ্য. সন্তানের নামে সম্পত্তি লিখে দিলেও ভোগ করতে পারবেন বাবা-মা: আইনমন্ত্রী সদ্য. এনসিপির কর্মসূচি ঘিরে সিলেটে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন সদ্য. আত্মসমর্পণের আগেই গ্রেপ্তার হতে পারেন শেখ হাসিনা: আইনমন্ত্রী সদ্য. মৌলভীবাজার থেকে সিলেটের পথে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা সদ্য. মিরপুর কলেজের দেয়াল ধস: টিসিবির নামে ভুল সংবাদ প্রকাশ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সদ্য. সাকিব আল হাসানকে টপকে এখন শীর্ষে পরীমনি সদ্য. ছাত্রলীগকে গুপ্ত থেকে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে বললেন প্রক্টর সদ্য. রাকসু জিএস আম্মারসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের সদ্য. লতিফ সিদ্দিকীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ ট্রাইব্যুনালের সদ্য. মানবপাচার ও অনলাইন স্ক্যাম প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সদ্য. সন্তানের নামে সম্পত্তি লিখে দিলেও ভোগ করতে পারবেন বাবা-মা: আইনমন্ত্রী সদ্য. এনসিপির কর্মসূচি ঘিরে সিলেটে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন সদ্য. আত্মসমর্পণের আগেই গ্রেপ্তার হতে পারেন শেখ হাসিনা: আইনমন্ত্রী সদ্য. মৌলভীবাজার থেকে সিলেটের পথে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা সদ্য. মিরপুর কলেজের দেয়াল ধস: টিসিবির নামে ভুল সংবাদ প্রকাশ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সদ্য. সাকিব আল হাসানকে টপকে এখন শীর্ষে পরীমনি সদ্য. ছাত্রলীগকে গুপ্ত থেকে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে বললেন প্রক্টর