বিশ্বের ভূরাজনীতিকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে কার্যত চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি একের পর এক প্রথাগত সীমারেখা ভেঙে চলেছেন। আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি, আকস্মিক সামরিক সিদ্ধান্ত ও উগ্র বক্তব্যের কারণে এখন শুধু আমেরিকার প্রতিপক্ষ নয়, তার দীর্ঘদিনের মিত্ররাও দিশেহারা।
ভেনেজুয়েলার সরকার পতন, দেশটির তেল ও খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘোষণা, শক্তি প্রয়োগ করে গ্রিনল্যান্ড দখলের ইচ্ছা প্রকাশ এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে সামরিক হামলার হুমকি—সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন পেশিশক্তিনির্ভর এক নতুন বাস্তবতা সামনে এনেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে আবারও সামরিক হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছেন।
দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার এক বছরের মাথায় এসে ট্রাম্প যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন, তাতে বিশ্বব্যাপী স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করা কাঠামোতে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে শান্তি ও সহযোগিতার লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রই গড়ে তুলেছিল, সেই ব্যবস্থাকেই এখন তার নেতৃত্বে দুর্বল হয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে।
এই পরিবর্তনে বিশ্ব একপ্রকার হতবাক। বন্ধু ও শত্রু—দুই পক্ষই নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান ঠিক করতে হিমশিম খাচ্ছে। ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে এবং এই ধারা স্থায়ী হবে কি না—নাকি ভবিষ্যতে কোনো প্রথাগত মার্কিন নেতৃত্ব আবার পুরোনো ধারায় ফেরাতে পারবে—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে।
ওবামা প্রশাসনের সাবেক পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা এবং বর্তমানে ‘গ্লোবাল সিচুয়েশন রুম’ কনসালটেন্সির প্রধান ব্রেট ব্রুয়েন মনে করেন, ট্রাম্পের তর্জন-গর্জন প্রত্যাশিত ছিল, কিন্তু আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার যে স্তম্ভগুলো এত দিন ভারসাম্য রক্ষা করেছে, সেগুলো যেভাবে দ্রুত ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে ভেঙে ফেলা হচ্ছে, তা গভীর উদ্বেগের বিষয়।
মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহারে কোনো দ্বিধা নেই—এমন বার্তা দিয়েছেন। জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা এবং জানুয়ারির শুরুতে ভেনেজুয়েলায় অভিযান তার উদাহরণ। যদিও প্রচারে তিনি নতুন সামরিক জট এড়ানোর কথা বলেছিলেন, বাস্তবে পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প বিশ্ব রাজনীতিতে এমন এক পুরোনো ধারণাকে ফিরিয়ে আনছেন, যেখানে বড় শক্তিগুলো নিজেদের সুবিধামতো অঞ্চল ভাগ করে নেয়—যা ‘প্রভাব বলয়’ নামে পরিচিত। উনিশ শতকের মনরো ডকট্রিনের আধুনিক রূপ হিসেবেই তিনি একে সাজিয়েছেন, যা অনেকের কাছে ‘ডনরো ডকট্রিন’ নামে পরিচিত। এতে মার্কিন মিত্ররা আতঙ্কিত হলেও রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তির জন্য এটি কৌশলগত সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলায় হামলার পর দেশটির খনিজ ও জ্বালানি সম্পদের বিষয়ে ট্রাম্পের প্রকাশ্য আগ্রহ আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। মুক্তবাণিজ্য, আইনের শাসন ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা আট দশকের পুরোনো বিশ্বব্যবস্থা যে ঝুঁকির মুখে, তা এখন অনেকের কাছেই স্পষ্ট।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি, সামরিক শক্তির প্রদর্শন, সীমান্তে কঠোরতা ও শুল্ক আরোপের কারণেই ট্রাম্প নির্বাচিত হয়েছেন এবং বিশ্বনেতারাও সেই বাস্তবতায় সাড়া দিচ্ছেন। প্রশাসনের প্রভাবশালী উপদেষ্টা স্টিফেন মিলারের ভাষায়, বর্তমান পৃথিবী চলে সামরিক শক্তি ও উলঙ্গ ক্ষমতার জোরে।
ইউরোপ আগে থেকেই ইউক্রেন প্রশ্নে ট্রাম্পের অনাগ্রহ নিয়ে শঙ্কিত ছিল। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার আগ্রহ সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। জার্মান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টাইনমায়ার যুক্তরাষ্ট্রকে মূল্যবোধের বিচ্যুতির অভিযোগ তুলে বিশ্বকে সতর্ক করেছেন, যাতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ‘ডাকাতদের আস্তানায়’ পরিণত না হয়।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, রাশিয়া বা চীনের দখল ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা প্রয়োজন। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন সতর্ক করে বলেছেন, এমন কোনো পদক্ষেপ ট্রান্স-আটলান্টিক জোটের অবসান ডেকে আনতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে কিছু ইউরোপীয় নেতা ন্যাটোর মাধ্যমে আর্কটিক অঞ্চলে সেনা মোতায়েনের কথাও তুলেছেন।
ট্রাম্পের খামখেয়ালি নীতির প্রভাব থেকে বাঁচতে এরই মধ্যে কয়েকটি মিত্র দেশ নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এশিয়ায়ও তার অবস্থান উদ্বেগ তৈরি করেছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনীতিকদের একাংশ মনে করছেন, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযান শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে স্থিতাবস্থা বদলের বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত।
অন্যদিকে, কিছু নেতা মনে করছেন, এই পদক্ষেপগুলো বিশ্বব্যবস্থার জন্য অতটা ধ্বংসাত্মক নয়, তবে ইউরোপের জন্য এটি ‘নিজেদের পথ নিজেরাই খোঁজো’—এমন বার্তা কি না, সে প্রশ্ন উঠছে। বেশির ভাগ মিত্র সরকার প্রকাশ্যে সমালোচনা এড়িয়ে চলেছে, কারণ তারা ট্রাম্পকে অসন্তুষ্ট করতে চায় না।
লাতিন আমেরিকায় ট্রাম্পের পদক্ষেপকে কেউ কেউ নতুন সাম্রাজ্যবাদের লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। সমর্থকদের মতে, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে এমন কঠোরতা প্রয়োজন ছিল। তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে শক্তি প্রয়োগের এই প্রবণতা চীন ও রাশিয়াকে তাদের প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে আরও আগ্রাসী হতে উৎসাহিত করতে পারে।
ভেনেজুয়েলার তেলের প্রতি ট্রাম্পের প্রকাশ্য লালসা সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে। যদিও ক্ষমতাচ্যুত নেতার অনুগতরাই আপাতত সেখানে ক্ষমতায়, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর চাপ দিচ্ছে মার্কিন তেল কোম্পানিকে বিশেষ সুবিধা দিতে। একই সঙ্গে ট্রাম্প ইরানে সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই পেশিশক্তিনির্ভর নীতি পশ্চিম গোলার্ধের বাইরেও বিস্তৃত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের নেতৃত্বে বিশ্ব এমন এক মোড় নিচ্ছে, যেখানে নিয়মের জায়গা নিচ্ছে শক্তি, আর সেই বাস্তবতায় নতুন করে হিসাব কষতে বাধ্য হচ্ছে পুরো আন্তর্জাতিক সমাজ।