ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে চতুর্থবারের মতো সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। বিগত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনামলে বিএনপির সঙ্গে যুগ্পৎ আন্দোলন শরিক ও জোট নেতাদেরও নিয়ে সকলের অন্তর্ভূক্তিমূলক ‘জাতীয় সরকার’ আদলে নতুন মন্ত্রিসভায় দেখা যেতে পারে। অবশ্য নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকবে না প্রধান বিরোধীদল চতুর্থবারের মতো জামায়াতে ইসলামীর কোনো প্রতিনিধিত্ব।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান গেল ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিন গুলশান মডেল স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও সেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বিগত দিনের আন্দোলন সঙ্গীদেরও সরকারে রাখার চিন্তা-ভাবনা রয়েছে বিএনপির। সেই আলোকে নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে নতুন মন্ত্রিসভায় নির্বাচিত নেতাদের পাশাপাশি টেকনোক্র্যাট কোটাতেও বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ ও মেধাবী নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে বিএনপি সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ৪০ থেকে ততোধিক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এবং উপমন্ত্রী দিয়ে শুরু হবে নতুন মন্ত্রিসভা। প্রয়োজনে এই সংখ্যা বাড়তে পারে। ইতোমধ্যেই নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার রূপরেখাও প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে দলটি। গতকাল শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে তারেক রহমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, সালাহউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেনসহ দলের আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে সিনিয়র নেতাদের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত তরুণ নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকদেরও মন্ত্রিপরিষদে স্থান দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার সূত্রে জানা গেছে, আগামী সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের (এমপি) শপথ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। এদিন সকালে সংসদ ভবনে সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। অপরদিকে একইদিন বিকেলে মন্ত্রিপরিষদের শপথ অনুষ্ঠিত হবে বঙ্গভবনে। তাদের শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি।
দলীয় ঘোষণানুযায়ী, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথমবারের মতো দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। নির্বাচনের আগেই দলীয়ভাবে তার নেতৃত্বে সরকার গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
বিএনপি সূত্র জানায়, তারেক রহমানের প্রথম মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও তরুণ নেতৃত্বের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মন্ত্রিসভা গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছেন তারেক রহমান। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পাশাপাশি টেকনোক্র্যাট কোটায় অনির্বাচিত বিশেষজ্ঞ ও জোটসঙ্গীদেরও অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তাভাবনা চলছে। অভিজ্ঞ ও তারুণ্যের মিশেলে মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে দলের ক্ষমতার ভরকেন্দ্র গুলশান চেয়ারম্যানের কার্যালয় ও সিনিয়র অনেক নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইতোমধ্যে অনেকেই দৌড়ঝাঁপ করছেন, শেষ মুহূর্তের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
জানা যায়, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সকল সদস্যই মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে যাচ্ছেন। স্থায়ী কমিটির এসব নেতা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে অপেক্ষাকৃত নবীনদের নিয়ে বিএনপির ৩১ দফার আলোকে দেশ পরিচালনায় এগিয়ে নিতে পারবেন বলে তারেক রহমান তাদের ওপর আস্থা রাখতে চান। সিনিয়র মন্ত্রী হিসেবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, ড. আব্দুল মঈন খান, সালাউদ্দিন আহমেদ, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন—এই ১০ জন পূর্ণমন্ত্রী অথবা সম্মানজনক পদ পেতে যাচ্ছেন।
জানা গেছে, নতুন সরকারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস গৃহায়ন ও গণপূর্ত, ড. খন্দকার আব্দুল মঈন খান তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক মন্ত্রণালয়, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রণালয়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, সালাহউদ্দিন আহমেদ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাচ্ছেন সদ্য প্রয়াত বিএনপি চেয়ারম্যান খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, আব্দুল আউয়াল মিন্টু সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, আব্দুস সালাম পিন্টু শিল্প মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন আ ন ম এহছানুল হক মিলন, তার পাশাপাশি শামা ওবায়েদ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, ড. রেজা কিবরিয়া অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদ দ্বিতীয়বারের মতো পেতে পারেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান পাচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সাবেক স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন, আমান উল্লাহ আমান পেতে পারেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, হাবিবুর রশীদ হাবিব দূর্যোগ ব্যবস্থাপণা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, মাহদী আমিন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় (আইসিটি), ববি হাজ্জাজ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, জয়নুল আবদীন ফারুক মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়, আজিজুল বারী হেলাল পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, হুম্মাম কাদের চৌধুরী শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, ব্যারিস্টার নওশাদ জমির খাদ্য মন্ত্রণালয়, সানজিদা তুলি নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন।
আইনমন্ত্রী হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছেন সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি সিনিয়র অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন ও ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের মধ্যে একজন। এর বাইরে বিএনপির মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসিরউদ্দিন অসীম, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেশের প্রধান আইন কর্মকর্তার (অ্যাটর্নী জেনারেল) পদ থেকে পদত্যাগ করে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান, আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামালের নাম শোনা যাচ্ছে।
এছাড়া, বিগত স্বৈরশাসক হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলন শরিকদের মধ্যে থেকেও তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় স্থান পাচ্ছেন জোট নেতারা। তাদের মধ্যে বিজেপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ রেলপথ মন্ত্রণালয়, গণসংসহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাচ্ছেন।
এর বাইরে টেকনোক্রেট কোটায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, বেগম সেলিমা রহমান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ মন্ত্রীত্ব পেতে পারেন বলে আলোচনা শোনা যাচ্ছে। দলটির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন টেকনোক্রেট কোটায়। মাহদী আমিনও টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে।
এদের বাইরে, সম্ভাব্য মন্ত্রী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন, খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির (সিলেট), আসাদুল হাবীব দুলু, আফরোজা খানম রিতা, মিজানুর রহমান মিনু, জহির উদ্দিন স্বপন, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, শরীফুল আলম, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল, জিকে গউছ, জাকারিয়া তাহের সুমন, ফজলুল হক মিলন, অধ্যক্ষ সেলিম ভূইয়া, ডা. মাহবুবুব রহমান লিটন, সাইদ আল নোমান, এসএম জিলানী, খন্দকার আবু আশফাক, ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল এবং দীপেন দেওয়ান।
জানা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ রয়েছে। আলোচনায় থাকা এসব নেতাদের মধ্যে কেউ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী পদ পেয়ে মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন বলে বিএনপিতে আলোচনা রয়েছে। যার সমাপ্তি ঘটবে আগামী সোমবার বিকেলের মধ্যেই। মন্ত্রী পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, ওইদিন বিকালে বঙ্গভবনের দরবার হলে রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দিন নতুন মন্ত্রী পরিষদের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন। সূত্র: দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস