মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সবার জন্য প্রযোজ্য হলেও সরকারের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এ কথা বলেন।
সংলাপে রাজনৈতিক নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীরা অংশ নেন। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক আলোচনায় মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতিফলন কতটা রয়েছে—এ বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
আইন উপদেষ্টা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক বিষয় উচ্চ আদালতে ন্যস্ত করা, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী মানবাধিকার আইন প্রণয়ন এবং আইনগত সহায়তা কার্যক্রম সম্প্রসারণ উল্লেখযোগ্য। তিনি জানান, বর্তমানে আগের তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি মানুষ আইনগত সহায়তার সুবিধা পাচ্ছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রসঙ্গে আসিফ নজরুল বলেন, আইনটি প্রায় ৯০ শতাংশ উন্নত করা হয়েছে এবং এর আওতায় দায়ের হওয়া ২০ হাজারের বেশি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়ার কথাও তিনি স্বীকার করেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, পূর্ণাঙ্গ সংস্কার একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া।
দেশকে আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরে এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক দল ও গণমাধ্যমের আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সততা, বিবেক, সহনশীলতা ও জবাবদিহি ছাড়া কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব নয়।
সংলাপটি সঞ্চালনা করেন সিজিএস সভাপতি জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিসর ততই সংকুচিত হয়। আইন সহজেই রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয় এবং সহিংসতা, সংঘর্ষ, হুমকি ও হয়রানি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মানবাধিকার সার্বজনীন, তা আপেক্ষিক নয়। তার মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো অর্থ, ক্ষমতা ও ধর্মকে পুঁজি করে রাজনীতি করছে এবং রাষ্ট্র নিজেই ‘মব কালচার’ বা দলবদ্ধ সহিংসতার বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর আত্মসমালোচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে আদিবাসীদের অধিকার অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে তিনি দেশের প্রতিষ্ঠাকালীন মূলনীতিগুলো সমুন্নত রাখার তাগিদ দেন এবং অর্থ, ক্ষমতা ও ধর্মকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব নিরসনের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা সংশোধন হলেও এর বাস্তবায়ন এখনো গভীরভাবে সমস্যাযুক্ত। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন বর্তমানে সাংবাদিকরা গুম ও হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রতিবেদন করতে ভয় পাচ্ছেন। তার মতে, লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কাই এর প্রধান কারণ। তিনি প্রকৃত ঐকমত্য গড়ে তোলার অভাবের কথাও উল্লেখ করেন এবং বলেন, কিছু জনগোষ্ঠীকে ‘সংখ্যালঘু’ আখ্যা দিয়ে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন নিউ এজ-এর দীর্ঘদিনের অপরাধ ও রাজনীতি প্রতিবেদক মুক্তাদির রশীদ রোমিও, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-এর প্রেসিডিয়াম সদস্য রাগিব আহসান মুন্না এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও রাজনৈতিক কর্মী মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর।