যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া (ইউএসসি) এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ডিয়েগোর (ইউসিএসডি) মৃতদেহ দান কর্মসূচি নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষা ও চিকিৎসা গবেষণার জন্য দান করা মৃতদেহ মার্কিন নৌবাহিনী ও বিদেশি সামরিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার মধ্যে ইসরায়েলি সামরিক সার্জনদের প্রশিক্ষণের বিষয়ও রয়েছে। এ নিয়ে চাঞ্চল্যকর বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
এই তথ্য সামনে আসার পর দাতাদের পরিবার এবং মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, মৃতদেহ দানকারীরা এমন ব্যবহারের বিষয়ে আগে থেকে অবহিত ছিলেন না।
নেভাডায় কর্মরত মেডিকেল কেস ম্যানেজার মিরিয়াম ভলপিন জানান, সম্প্রতি তিনি এক বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিকের কাছ থেকে এমন একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে পারেন, যেখানে দাবি করা হয়—ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায় দানকৃত মৃতদেহ সামরিক প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হতে পারে।
ভলপিনের ১০১ বছর বয়সী মা জিনেট ভলপিন ২০২১ সালে মারা যান এবং তার মরদেহ ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায় দান করা হয়েছিল। বিষয়টি জানার পর তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন যে, তার মায়ের মরদেহ হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রের মতো পরিস্থিতিতে চিকিৎসা প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়েছে।
তিনি বলেন, “এটা শুনে আমি অসুস্থ বোধ করেছি। আমরা কখনোই জানতাম না এমন কিছু হতে পারে।”
আল-জাজিরার একটি অনুসন্ধানী ডকুমেন্টারি সিরিজের তদন্তে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ‘ডিরেক্ট ফ্রম’-এ উঠে আসে, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ডিয়েগো দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নৌবাহিনীর সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে মৃতদেহ সরবরাহ করে আসছে, যা সামরিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া অন্তত ৮৯টি মৃতদেহ নৌবাহিনীর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সরবরাহ করেছে।
অন্যদিকে, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের শুরুর মধ্যে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ডিয়েগো থেকে প্রায় ১২৪টি মৃতদেহ ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায় স্থানান্তর করা হয় বলে শিক্ষার্থী সাংবাদিকদের তদন্তে জানা গেছে।
একটি ২০২০ সালের গবেষণাপত্রে বলা হয়, প্রশিক্ষণের সময় মরদেহে বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতো, যাকে ‘পারফিউশন’ বলা হয়। এই প্রক্রিয়ায় মরদেহে কৃত্রিম রক্ত প্রবাহিত করা হয়, যাতে যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈনিকদের মতো বাস্তব পরিস্থিতি তৈরি করা যায়। প্রশিক্ষণে গুলিবিদ্ধ হওয়া, বিস্ফোরণজনিত ক্ষতি এবং গুরুতর আঘাতের মতো দৃশ্য অনুকরণ করা হতো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
মার্কিন নৌবাহিনীর দাবি, এটি একটি উচ্চমানের চিকিৎসা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, যেখানে অভিজ্ঞ সার্জনরা বাস্তবসম্মত পরিবেশে দক্ষতা অর্জন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দাবি করছে, এই কার্যক্রম শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, দাতাদের পরিবারকে সামরিক ব্যবহারের বিষয়টি আগে থেকে জানানো হয়নি।
ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার সঙ্গে যুক্ত এক চিকিৎসক মোহাম্মদ রাদ প্রশ্ন তোলেন—দাতারা যদি জানতেন যে তাদের মরদেহ সামরিক প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হতে পারে, তাহলে তারা কি এই সিদ্ধান্ত নিতেন?
অনেক পরিবার এখন প্রতারিত হওয়ার দাবি করছেন। তারা বলছেন, “আমি কখনো ভাবিনি আমাদের পরিবারের মরদেহ এভাবে সামরিক কাজে ব্যবহার হতে পারে।”
এই ঘটনার পর অনেক সম্ভাব্য দাতা তাদের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছেন বলেও জানা গেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা