ইরানে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ জনে। দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। গতকাল শনিবার ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভ দমনে আরও কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।
ইরানের অভিজাত বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সতর্ক করে বলেছে, দেশের নিরাপত্তা রক্ষাই তাদের জন্য শেষ কথা এবং বর্তমান পরিস্থিতি আর চলতে দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা সরকারি সম্পদ ও কৌশলগত অবকাঠামো সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক এই বিক্ষোভ দমনে সরকারের তৎপরতা বাড়ার মধ্যেই আইআরজিসি ও সেনাবাহিনীর এমন বক্তব্য এলো।
এর আগে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের নেতাদের আবার সতর্ক করেন। শনিবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাহসী জনগণের পাশে রয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম জানায়, রাজধানী তেহরানের পশ্চিমে কারাজ শহরে একটি পৌর ভবনে আগুন দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার জন্য ‘দাঙ্গাবাজদের’ দায়ী করা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে বিক্ষোভে নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জানাজার দৃশ্যও প্রচার করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিরাজ, কোম ও হামেদান শহরে বিক্ষোভ চলাকালে এসব সদস্য নিহত হয়েছেন।
মূলত মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হলেও দ্রুত তা রাজনৈতিক রূপ নেয়। গত ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া এই আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা বর্তমান শাসনের অবসান দাবি করছেন। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এসব ‘দাঙ্গা’ উসকে দিচ্ছে।
এদিকে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ছেলে রেজা পাহলভি বিদেশ থেকে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন।
ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এক চিকিৎসক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, শুক্রবার থেকে বিপুল সংখ্যক আহত বিক্ষোভকারী হাসপাতালে আনা হচ্ছে। অনেকের মাথায় গুরুতর আঘাত, কারও হাত-পা ভাঙা এবং কারও শরীরে গভীর ক্ষত রয়েছে। একটি হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ অন্তত ২০ জনকে নেওয়া হয়েছিল, যাদের মধ্যে পাঁচজন পরে মারা যান।
আইআরজিসির জনসংযোগ দপ্তর জানায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় গাচসারানে ‘সশস্ত্র দাঙ্গাবাজদের’ সঙ্গে সংঘর্ষে বসিজ বাহিনীর তিন সদস্য নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছেন। পশ্চিমাঞ্চলীয় হামেদানে নিরাপত্তা বাহিনীর এক কর্মকর্তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। উত্তর-পূর্বের মাশহাদে এক ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের ছেলে নিহত হয়েছেন। খুজেস্তানের শুশতার এলাকায় গত দুই রাতে নিরাপত্তা বাহিনীর আরও দুই সদস্য নিহত হন।
ইরানের মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, শুক্রবার পর্যন্ত তারা ৬৫ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করেছে। নিহতদের মধ্যে ৫০ জন বিক্ষোভকারী এবং ১৫ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।
সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ রাখায় অনেক তথ্য বহির্বিশ্বে পৌঁছাচ্ছে না। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের এক বাসিন্দা রয়টার্সকে জানান, তাদের এলাকায় আইআরজিসির সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং তারা গুলি চালাচ্ছেন। নিরাপত্তার কারণে তিনি নিজের পরিচয় প্রকাশ করেননি।
রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, গত দুই রাতে ‘সন্ত্রাসীরা’ সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এতে বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন এবং বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের অর্জন রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের জন্য রেড লাইন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় রেজা পাহলভি বলেন, আন্দোলনের লক্ষ্য এখন শুধু রাস্তায় নামা নয়, বরং শহরের কেন্দ্রস্থল দখল ও ধরে রাখার প্রস্তুতি নিতে হবে। তিনি পরিবহন, তেল, গ্যাস ও জ্বালানি খাতের শ্রমিকদের দেশব্যাপী ধর্মঘটের আহ্বান জানান।
বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, আপাতত তিনি পাহলভির সঙ্গে সাক্ষাতে আগ্রহী নন। এর আগে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভকারীদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারে। শুক্রবার আরও কড়া ভাষায় তিনি বলেন, গুলি চালানো হলে তার জবাবও দেওয়া হবে।
রাজপথে কিছু বিক্ষোভকারী পাহলভির পক্ষে স্লোগান দিলেও অধিকাংশ স্লোগানে বর্তমান সরকারের পতন ও অর্থনৈতিক সংকট সমাধানের দাবি উঠে আসছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও গত বছরের যুদ্ধের ক্ষত ইরানের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান বিক্ষোভ অন্তত তিন বছরের মধ্যে ইরানের শাসকদের জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ। শুক্রবার ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে বিক্ষোভকারীদের হত্যার নিন্দা জানিয়ে ইরানকে সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
ইরানি কর্তৃপক্ষ বলছে, শান্তিপূর্ণ অর্থনৈতিক বিক্ষোভ বৈধ, তবে সহিংস দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। শুক্রবার সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি অভিযোগ করেন, বিক্ষোভকারীরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হয়ে কাজ করছে এবং বিদেশি শক্তির ‘ভাড়াটে’ কাউকে সহ্য করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন।
নরওয়েভিভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হেঙ্গাওয়ের হিসাবে, গত দুই সপ্তাহে ইরানে আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে।