গত বুধবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ–এর অধীন উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি–এর চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পো–এর কাছে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠান। চিঠিতে বলা হয়, উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হলে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, চলমান সংস্কারগুলো সংহত করা এবং ‘মসৃণ উত্তরণ কৌশল’-এর অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় নীতিগত সুযোগ তৈরি হবে।
বাণিজ্য সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তা
চিঠিতে এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য সুবিধা নিয়ে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তৈরি পোশাক খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাধারণ অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধার উন্নত সংস্করণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য জটিলতা, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির পরিবর্তন এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি—এসব বিষয় উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়।
সরকারের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে পণ্য রপ্তানিতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেই বাংলাদেশ এখনো অতিমাত্রায় তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। এ অবস্থায় অল্প সময়ের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধা হারালে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও উন্নয়নের গতি দুর্বল হতে পারে।
সংস্কার অগ্রগতি থাকলেও ধীরগতি
চিঠিতে জানানো হয়, শুল্ক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, জ্বালানি খাত সংস্কার, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং শিল্পকারখানার মান-অনুগত্য অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রগতি হয়েছে। তবে একের পর এক দেশি ও আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে এসব কর্মসূচি নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী এগোতে পারেনি।
এ প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশ, স্থলবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ ও ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি কার্যালয়ের করা স্বাধীন ‘উত্তরণ প্রস্তুতি মূল্যায়ন’ বিবেচনায় নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
দেশি-বিদেশি সংকটের প্রভাব
চিঠিতে বলা হয়, এলডিসি উত্তরণের পাঁচ বছরের প্রস্তুতি সময়কাল একাধিক সংকটে ‘গুরুতরভাবে ব্যাহত’ হয়েছে। দেশীয় চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে আর্থিক খাতে অনিয়ম, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন এখনো নিষ্পত্তি না হওয়া।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে করোনা মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ধীরগতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাতে জ্বালানি ও খাদ্যবাজারে অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার কড়াকড়ি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়। এসব কারণে মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি কমেছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগে ভাটা পড়েছে এবং কর-জিডিপি অনুপাত হ্রাস পেয়েছে বলে সরকারের দাবি।
আগের সুপারিশ ও বর্তমান উদ্যোগ
সূত্র জানায়, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার নেপাল ও লাওসের মতো একই সময়ে উত্তরণের অপেক্ষায় থাকা দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করেছিল। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। সে ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার তিন বছর সময় বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে।
বর্তমানে চূড়ান্ত উত্তরণের আগে তৃতীয় পর্যালোচনা প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। এখন জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থার সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ।