ইউরোপের অভিবাসন ইতিহাসে এক নতুন ও বিতর্কিত অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা আলোচনা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যকার মতভেদ দূর করে অবশেষে আলোর মুখ দেখছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ‘নতুন মাইগ্রেশন এবং আশ্রয় চুক্তি’ (New Pact on Migration and Asylum)। ২০২৬ সালের জুন মাস থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ডেনমার্ক বাদে বাকি ২৬টি দেশে এই অভিন্ন ইমিগ্রেশন আইন কার্যকর হতে যাচ্ছে।
ইউরোপের অভিবাসন ইতিহাসে এক নতুন ও বিতর্কিত অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা আলোচনা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যকার মতভেদ দূর করে অবশেষে আলোর মুখ দেখছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ‘নতুন মাইগ্রেশন এবং আশ্রয় চুক্তি’ (New Pact on Migration and Asylum)। ২০২৬ সালের জুন মাস থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ডেনমার্ক বাদে বাকি ২৬টি দেশে এই অভিন্ন ইমিগ্রেশন আইন কার্যকর হতে যাচ্ছে।
ব্রাসেলসের নীতিনির্ধারকরা এই পদক্ষেপকে ইউরোপীয় ঐক্যের একটি ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে দেখছেন। তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নতুন আইনের ফলে ইউরোপের সীমানা আগের চেয়ে অনেক বেশি দুর্ভেদ্য হয়ে উঠবে। বিশেষ করে অনিয়মিত বা অবৈধ উপায়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা যারা করছেন, তাদের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
এক দেশের আঙুলের ছাপ দেখবে ২৬ দেশ
নতুন এই ‘প্যাক্ট’ বা চুক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হচ্ছে ‘ইউরোড্যাক’ (Eurodac) নামক একটি অত্যাধুনিক বায়োমেট্রিক ডাটাবেস। বর্তমানে কোনো অভিবাসী এক দেশে ধরা পড়লে বা আবেদন করলে অনেক সময় অন্য দেশে গিয়ে পরিচয় গোপন করে পুনরায় আবেদনের সুযোগ পান। ২০২৬ সালের জুন থেকে সেই পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
নতুন নিয়মে কোনো ব্যক্তি ইউরোপের সীমান্তে পা রাখা মাত্রই তার আঙুলের ছাপ এবং ফেসিয়াল ইমেজ বা মুখের ছবি সংগ্রহ করা হবে। এই তথ্য মুহূর্তের মধ্যে ইইউ-ভুক্ত ২৭টি দেশের কেন্দ্রীয় সার্ভারে পৌঁছে যাবে। এর ফলে তথাকথিত ‘অ্যাসাইলাম শপিং’ বা এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঘুরে ঘুরে আশ্রয়ের আবেদন করার দিন শেষ হতে চলেছে। যারা অবৈধভাবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি জমাবেন, তারা সহজেই ধরা পড়ে যাবেন।
বর্ডারে দ্রুত স্ক্রিনিং ও কঠোর যাচাই
আগে ইউরোপের সীমান্তে পৌঁছানোর পর একজন অভিবাসীকে তার প্রাথমিক পরিচয় নিশ্চিত করতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হতো। কিন্তু নতুন আইনে প্রবর্তন করা হয়েছে ‘প্রি-এন্ট্রি স্ক্রিনিং’। এর অধীনে মাত্র সাত দিনের মধ্যে একজন ব্যক্তির স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং তিনি ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য হুমকি কি না, তা নিশ্চিত করা হবে।
যাদের আবেদনের প্রাথমিক ভিত্তি থাকবে না, তাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে। অর্থাৎ, ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশের আগেই সীমানা থেকেই তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এটি মূলত একটি ‘ফিল্টারিং’ প্রক্রিয়া, যা অনিয়মিত অভিবাসীদের প্রবেশাধিকার কমিয়ে দেবে।
১২ সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন নিষ্পত্তি নিয়ে ইউরোপে যে দীর্ঘসূত্রতা ছিল, তার অবসান ঘটাতে আনা হয়েছে ১২ সপ্তাহের কঠোর ডেডলাইন। বিশেষ করে যারা এমন সব দেশ থেকে এসেছেন (যেমন: মরক্কো, তিউনিসিয়া বা তুরস্ক), যাদের নাগরিকদের আশ্রয়ের আবেদনের স্বীকৃতির হার গড়ে ২০ শতাংশের কম, তাদের মামলাগুলো এই বিশেষ ক্যাটাগরিতে দ্রুত বিচার করা হবে।
এর ফলে যারা স্রেফ অর্থনৈতিক সচ্ছলতার আশায় আশ্রয়ের ভুয়া আবেদন করে বছরের পর বছর ইউরোপে থেকে যেতেন, তাদের জন্য সময়টি সংকুচিত হয়ে আসছে। মাত্র তিন মাসের মধ্যে তাদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যাবে এবং আবেদন নাকচ হলে দ্রুততম সময়ে তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করা হবে।
‘বাধ্যতামূলক সংহতি’ ও দায়িত্ব ভাগাভাগি
ইতালি, গ্রিস বা স্পেনের মতো ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসীদের চাপের মুখে একা লড়াই করে আসছিল। এই সংকট নিরসনে ‘ম্যান্ডেটরি সলিডারিটি’ বা বাধ্যতামূলক সংহতি নীতি প্রবর্তন করা হয়েছে। নতুন আইন অনুযায়ী, ইইউ-র প্রতিটি দেশ নির্দিষ্ট সংখ্যক অভিবাসীর দায়িত্ব নিতে বাধ্য থাকবে।
তবে কোনো দেশ যদি অভিবাসী নিতে না চায়, তবে তাদের আর্থিক জরিমানা বা কারিগরি সহায়তা দিতে হবে। খসড়া অনুযায়ী, প্রতিজন অভিবাসীর বিপরীতে ২০ হাজার ইউরো করে কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা দিতে হতে পারে। এই অর্থ মূলত সীমান্ত রক্ষা এবং অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হবে। হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ডের মতো কট্টরপন্থী দেশগুলো এই নিয়মের তীব্র বিরোধিতা করলেও মেজরিটি ভোটে এটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।
শিশুদের অধিকার ও মানবিক সুরক্ষা
আইন কঠোর করা হলেও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর চাপের মুখে কিছু মানবিক ধারা যুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে একা আসা শিশুদের (Unaccompanied Minors) ক্ষেত্রে ডিটেনশন বা আটকে রাখার নিয়ম শিথিল করা হয়েছে। শিশুদের দ্রুত আইনি অভিভাবক প্রদান এবং তাদের শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এই চুক্তিতে। তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে, বর্ডারে দ্রুত স্ক্রিনিংয়ের ফলে অনেক সময় প্রকৃত বিপদগ্রস্ত মানুষও সুবিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের ওপর প্রভাব
ইউরোপে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির ওপর এই আইনের বড় ধরনের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত, যারা ইতিমধ্যে বৈধভাবে রেসিডেন্সি কার্ড বা নাগরিকত্ব নিয়ে বসবাস করছেন, তাদের জন্য ভয়ের কিছু নেই। বরং ইউরোপের শ্রমবাজার এবং যাতায়াত ব্যবস্থা আরও সুশৃঙ্খল হওয়ায় তারা লাভবান হতে পারেন।
তবে দুশ্চিন্তার বিষয় তাদের জন্য, যারা দালালের খপ্পরে পড়ে সাগরপথে বা অবৈধ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ইউরোপে আসার স্বপ্ন দেখছেন। ২০২৬ সালের পর ধরা পড়লে তাদের পরিচয় গোপন রাখা প্রায় অসম্ভব হবে। এছাড়া ফ্রান্সে বা জার্মানিতে যারা আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে ঝুলে আছেন, তাদের আবেদনগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির মুখে পড়বে। এতে বড় একটি অংশের আবেদন প্রত্যাখ্যান হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাবে।
চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে সদস্য দেশগুলো
এখন ২০২৪ সাল শেষ হয়ে ২০২৫ আসছে। ইইউ কমিশন জানিয়েছে, আগামী দুই বছর হবে ‘ট্রানজিশন পিরিয়ড’ বা রূপান্তরকাল। এই সময়ের মধ্যে প্রতিটি দেশ তাদের অভ্যন্তরীণ আইনগুলো এই নতুন চুক্তির সাথে সমন্বয় করবে। অনেক দেশ ইতিমধ্যে তাদের সীমান্ত চৌকিগুলোতে বায়োমেট্রিক স্ক্যানার বসানোর কাজ শুরু করেছে।
ব্রাসেলসের এই নতুন নীতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ইউরোপ এখন আর কেবল একটি উন্মুক্ত মহাদেশ নয়, বরং এটি একটি সুনিয়ন্ত্রিত ‘ফোর্ট্রেস’ বা দুর্গে পরিণত হতে যাচ্ছে। বৈধ মেধা ও শ্রমের কদর থাকলেও, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের জন্য ইউরোপের দরজা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
সূত্র: ইউরোপীয় কমিশন (ইমিগ্রেশন বিভাগ), রয়টার্স এবং ইনফো-মাইগ্রেন্টস।