শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

ইসরায়েলের পরমাণু ডকট্রিন কেন বিশ্বের জন্য হুমকি

দশকের পর দশক ধরে ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারকে বিশ্ব এক ধরনের অস্বস্তিকর গোপন বাস্তবতা হিসেবে দেখেছে। অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা থাকলেও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা খুব কমই হয়। ইসরায়েল কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কথা স্বীকার করেনি, তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে দেশটি উল্লেখযোগ্য পারমাণবিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

A
Admin
২৫ জুলাই, ২০২৬
দশকের পর দশক ধরে ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারকে বিশ্ব এক ধরনের অস্বস্তিকর গোপন বাস্তবতা হিসেবে দেখেছে। অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা থাকলেও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা খুব কমই হয়। ইসরায়েল কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কথা স্বীকার করেনি, তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে দেশটি উল্লেখযোগ্য পারমাণবিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েলের কাছে আনুমানিক ৮০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। পাশাপাশি বিমান ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ সম্ভাব্য ডেলিভারি ব্যবস্থাও রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এই নীতিকে ‘পারমাণবিক অস্পষ্টতা’ বলা হয়, যেখানে অস্ত্রের অস্তিত্ব না কোন নিশ্চিত করা হয়, না অস্বীকার করা হয়।

এই কৌশলগত দ্ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া থেকে দূরে রেখেছে—কোন পরিস্থিতিতে ইসরায়েল এই অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্ন আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সঙ্গে একটি ঝুঁকিপূর্ণ সংঘাতে জড়িত। শনিবার ইরান দিমোনা শহরে হামলা চালিয়ে দেখিয়েছে, পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাতের জবাব দেওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।

ইসরায়েলের কৌশলগত চিন্তাধারা দীর্ঘদিন ধরে অস্তিত্বগত হুমকির ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে। অন্যান্য পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র যেখানে প্রতিরোধমূলক ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে, সেখানে ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তাকে প্রায়শই অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করে। ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালের যুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমান ইরান, গাজা ও লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাত—সব ক্ষেত্রেই এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে।

সাধারণভাবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সীমা অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে নির্ধারিত থাকে এবং এগুলো মূলত প্রতিরোধমূলক ভূমিকা পালন করে। তবে ইসরায়েলের কৌশলগত চিন্তায় এমন ধারণাও রয়েছে যে, কোনো অ-পারমাণবিক উৎস থেকেও যদি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে, তবে পারমাণবিক বিকল্প বিবেচনায় আসতে পারে।

‘স্যামসন অপশন’ নামে পরিচিত একটি ধারণা দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত আলোচনায় রয়েছে। এতে বলা হয়, চূড়ান্ত পরাজয়ের মুখে পড়লে ইসরায়েল পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পথে যেতে পারে। এ ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক নীতির অস্তিত্ব নিশ্চিত নয়, তবে ধারণাটি ইঙ্গিত করে—রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়লে সংঘাতের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।

এই ধারণার নামকরণ বাইবেলের চরিত্র স্যামসনের নাম অনুসারে, যিনি নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে শত্রুদের ধ্বংস করেছিলেন। একইভাবে ধারণা করা হয়, যদি কোনো শক্তি ইসরায়েলকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়, তবে দেশটি পাল্টা আঘাতে প্রতিপক্ষকেও ব্যাপক ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে।

বর্তমান আঞ্চলিক বাস্তবতায় এই উদ্বেগ আরও বাড়ছে। গাজা, লেবানন, সিরিয়া ও ইরানকে ঘিরে বিস্তৃত সংঘাতের জালে ইসরায়েল জড়িয়ে আছে। একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা এখন আর কেবল তাত্ত্বিক নয়।

এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েল নিজেদেরকে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক জোটের মুখোমুখি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। কোনো সংঘাতকে যত বেশি অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখা হয়, ততই চরম পদক্ষেপ নেওয়ার মানসিক বাধা কমে যায়। এ কারণেই অধিকাংশ রাষ্ট্র তাদের পারমাণবিক নীতি কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক তদারকির আওতায় রাখে।

কিন্তু ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে। দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী নয় এবং তাদের স্থাপনাগুলো আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের আওতায় পড়ে না। ফলে বৈশ্বিক নিরাপত্তায় একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র কার্যত আন্তর্জাতিক নজরদারির বাইরে অবস্থান করছে।

গাজায় সাম্প্রতিক সংঘাতও পরিস্থিতির তীব্রতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসামরিক স্থাপনা বারবার আঘাতের শিকার হয়েছে। ধ্বংসযজ্ঞের এই মাত্রাকে অনেক মানবাধিকার সংস্থা ও আইনবিদ গণহত্যাসদৃশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়েই গাজায় ব্যবহৃত বিস্ফোরক শক্তি অত্যন্ত উচ্চমাত্রার ছিল, যা তুলনামূলকভাবে পারমাণবিক বিস্ফোরণের শক্তির সঙ্গে আলোচনায় এসেছে। যদিও এই তুলনা সরাসরি সমতুল্য নয়, তবুও এটি দেখায়—জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ইসরায়েল কতটা ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ করতে প্রস্তুত। এর ফলে প্রশ্ন উঠছে, যদি তারা নিজেদের পরাজয়ের মুখে মনে করে, তবে তাদের কৌশলগত সীমা কোথায়।

এ ছাড়া ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্তমান সরকারকে অনেকেই কঠোরপন্থী হিসেবে বিবেচনা করেন, যেখানে কিছু নেতা আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে কঠিন অবস্থানের পক্ষে কথা বলেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমাজেও জাতীয়তাবাদী ও সামরিকমুখী প্রবণতা বেড়েছে, যা ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ সংজ্ঞাকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্য বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে সম্ভাব্য পারমাণবিক ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

শিরোনাম:
সদ্য. রাকসু জিএস আম্মারসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের সদ্য. লতিফ সিদ্দিকীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ ট্রাইব্যুনালের সদ্য. মানবপাচার ও অনলাইন স্ক্যাম প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সদ্য. সন্তানের নামে সম্পত্তি লিখে দিলেও ভোগ করতে পারবেন বাবা-মা: আইনমন্ত্রী সদ্য. এনসিপির কর্মসূচি ঘিরে সিলেটে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন সদ্য. আত্মসমর্পণের আগেই গ্রেপ্তার হতে পারেন শেখ হাসিনা: আইনমন্ত্রী সদ্য. মৌলভীবাজার থেকে সিলেটের পথে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা সদ্য. মিরপুর কলেজের দেয়াল ধস: টিসিবির নামে ভুল সংবাদ প্রকাশ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সদ্য. সাকিব আল হাসানকে টপকে এখন শীর্ষে পরীমনি সদ্য. ছাত্রলীগকে গুপ্ত থেকে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে বললেন প্রক্টর সদ্য. রাকসু জিএস আম্মারসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের সদ্য. লতিফ সিদ্দিকীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ ট্রাইব্যুনালের সদ্য. মানবপাচার ও অনলাইন স্ক্যাম প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সদ্য. সন্তানের নামে সম্পত্তি লিখে দিলেও ভোগ করতে পারবেন বাবা-মা: আইনমন্ত্রী সদ্য. এনসিপির কর্মসূচি ঘিরে সিলেটে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন সদ্য. আত্মসমর্পণের আগেই গ্রেপ্তার হতে পারেন শেখ হাসিনা: আইনমন্ত্রী সদ্য. মৌলভীবাজার থেকে সিলেটের পথে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা সদ্য. মিরপুর কলেজের দেয়াল ধস: টিসিবির নামে ভুল সংবাদ প্রকাশ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সদ্য. সাকিব আল হাসানকে টপকে এখন শীর্ষে পরীমনি সদ্য. ছাত্রলীগকে গুপ্ত থেকে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে বললেন প্রক্টর