মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম 'মিডল ইস্ট আই' এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব ইতোমধ্যে মার্কিন বাহিনীকে তাদের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত কিং ফাহাদ বিমান ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই ঘাঁটিটি ইরানের শাহেদ ড্রোনের নাগালের বাইরে হওয়ায় এটি লজিস্টিক সহায়তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের জেদ্দা বন্দর এখন মার্কিন বাহিনীর রসদ সরবরাহের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-সংকট শুরু হওয়ার সময় উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের ভূখণ্ডকে সামরিক হামলার লঞ্চপ্যাড হিসেবে ব্যবহার না করার শর্ত দিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে সেই অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত মিলছে।
সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান ও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে সাম্প্রতিক বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের এই নীতিগত পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ইরানের পক্ষ থেকে সৌদি জ্বালানি অবকাঠামো ও রাজধানী রিয়াদে চালানো হামলা।
পশ্চিমা কর্মকর্তারা বলছেন, রিয়াদ এখন ইরানকে তাদের ‘আক্রমণাত্মক আচরণের’ জন্য শাস্তি দিতে আগ্রহী। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতও যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে, তারা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে ওয়াশিংটনের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করবে না। ইউএইর পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে জানিয়েছেন, তাদের দেশ অন্তত নয় মাসের যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে।
তবে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার প্রশ্নে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে এখনো বিভক্তি রয়েছে। কাতার ও ওমান উত্তেজনা প্রশমনের ওপর জোর দিচ্ছে। কাতারের রাস লাফান রিফাইনারিতে ইরানের হামলায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা মেরামতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে, ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি স্পষ্টভাবে বলেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ নয় এবং ইসরায়েলই মূলত ওয়াশিংটনকে এতে জড়িয়েছে।
এদিকে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান সতর্ক করে বলেছেন, প্রয়োজন হলে রিয়াদ সামরিক ব্যবস্থা নিতে পিছপা হবে না। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সৌদি আরব ও আমিরাত এখন ইরানের সঙ্গে সহাবস্থানের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করছে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের মতো কৌশলগত বিষয়কে কেন্দ্র করে।
তবে এই যুদ্ধে ইসরায়েলের ভূমিকা এবং জনমতের চাপ উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, ইসরায়েল উপসাগরীয় দেশগুলোকে এই সংঘাতে টেনে আনার চেষ্টা করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার সুস্পষ্ট কৌশল নেই।
অন্যদিকে, ইরানের সামরিক সক্ষমতাও উদ্বেগের বড় কারণ। তেহরান ইতোমধ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে নিখুঁত হামলা চালানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে এবং রাশিয়া ও চীনের কাছ থেকে গোয়েন্দা ও সামরিক সহায়তা পাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে সরাসরি সামরিক অভিযানে জড়ানো সৌদি আরবের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বর্তমানে যুদ্ধের চতুর্থ সপ্তাহে এসে সৌদি আরব ও ইউএই হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সম্ভাব্য অভিযানে যোগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। ইউএইর কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ জানিয়েছেন, প্রয়োজনে তারা এ ধরনের অভিযানে অংশ নিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব সরাসরি ইরানে হামলার পরিবর্তে ‘প্রাণঘাতী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’ জোরদার করার কৌশল গ্রহণ করতে পারে। তবে যদি মার্কিন বাহিনী সৌদি ঘাঁটি থেকে সরাসরি ইরানে হামলা চালায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন মাত্রা পেতে পারে।
সব মিলিয়ে, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন এক জটিল কূটনৈতিক ও সামরিক ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।