শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

বিজেপির বাংলা জয় কি এবার রাম, পরে বাম—বাম ভোটারদের নীরব কৌশলেই

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে ক্ষমতা থেকে সরাতে গিয়ে বাম সমর্থকদের একটি বড় অংশ বিজেপির পক্ষে ভোট দিয়েছেন বলে দাবি উঠেছে। উত্তর চব্বিশ পরগনার নিউ ব্যারাকপুরের সিপিআই (এম) কর্মী রঞ্জিত রায় বলেন, সংগঠনগত দুর্বলতার কারণে তৃণমূলকে হারানোর জন্য তাঁদের সমর্থকেরা বিজেপিকেই কার্যকর শক্তি হিসেবে দেখেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বড় জয়ের পেছনে বাম ভোটারদের এই নীরব সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

A
Admin
২৫ জুলাই, ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে ক্ষমতা থেকে সরাতে গিয়ে বাম সমর্থকদের একটি বড় অংশ বিজেপির পক্ষে ভোট দিয়েছেন বলে দাবি উঠেছে। উত্তর চব্বিশ পরগনার নিউ ব্যারাকপুরের সিপিআই (এম) কর্মী রঞ্জিত রায় বলেন, সংগঠনগত দুর্বলতার কারণে তৃণমূলকে হারানোর জন্য তাঁদের সমর্থকেরা বিজেপিকেই কার্যকর শক্তি হিসেবে দেখেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বড় জয়ের পেছনে বাম ভোটারদের এই নীরব সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এই বাস্তবতার ইঙ্গিত দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। গত ৪ মে ভবানীপুরে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করার পর বিজয় ভাষণে তিনি বলেন, সেখানে সিপিএমের প্রায় ১৩ হাজার ভোটের মধ্যে অন্তত ১০ হাজার ভোট তাঁর পক্ষে এসেছে। ভবানীপুরের সিপিআই (এম) সমর্থকদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতাও জানান।

শুধু ভবানীপুর নয়, দমদম উত্তরসহ রাজ্যের একাধিক আসনে একই প্রবণতা দেখা গেছে। একসময় বামেদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত দমদম উত্তরে এবার বামফ্রন্ট যুবনেত্রী দীপ্সিতা ধরকে প্রার্থী করলেও শেষ পর্যন্ত জয় পেয়েছে বিজেপি। বামপন্থীদের ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির পরও তাদের ভোটারদের এই সরে যাওয়া রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের সূত্রপাত মূলত ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনকে ঘিরে। ওই নির্বাচনে সহিংসতা, বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়ন দাখিলে বাধা এবং বাম কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় তৃণমূলের বিরুদ্ধে বাম সমর্থকদের ক্ষোভ বাড়তে থাকে। নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষায় তারা বিজেপিকে বিকল্প শক্তি হিসেবে দেখা শুরু করেন।

এর প্রতিফলন প্রথম স্পষ্ট হয় ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে, যখন বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ১৮টি আসন দখল করে। সে সময় সিপিআই (এম) নেতা সীতারাম ইয়েচুরিও স্বীকার করেছিলেন, তৃণমূলের সন্ত্রাসের কারণে অনেক বাম সমর্থক বিজেপির দিকে ঝুঁকেছেন। একই ধারা বজায় থাকে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও, যেখানে বিজেপি ৭৭টি আসনে জয় পায়।

মাঠপর্যায়ের এক বাম সমর্থক সে সময় বলেছিলেন, তাঁরা আদর্শগতভাবে কমিউনিস্ট হলেও তৃণমূলকে হারানোর জন্য সাময়িকভাবে বিজেপিকে ভোট দিচ্ছেন। তৃণমূলের পতনের পর আবার বাম রাজনীতিতেই ফিরে যাওয়ার প্রত্যাশা ছিল তাঁদের।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলায় এই অস্বাভাবিক সমীকরণের পেছনে দুটি বিষয় বড় ভূমিকা রেখেছে। প্রথমত, ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিরোধী দমন-পীড়নের অভিযোগ। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ রিয়াজ বলেন, বামপন্থীরা কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়ায় সাধারণ হিন্দু বাম ভোটারদের একটি অংশ বিজেপিকে বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করেন।

দ্বিতীয়ত, এবারের নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করেছে। নিউ ব্যারাকপুরের সিপিআই (এম) কর্মী কৃষ্ণেন্দু মৈত্রের ভাষ্য, দীর্ঘদিন পর মানুষ ভয়মুক্ত পরিবেশে ভোট দিতে পেরেছেন। তৃণমূলকে হারানোর লক্ষ্যেই বহু ভোটার বিজেপিকে সমর্থন করেছেন।

তবে বাম কর্মীদের একটি অংশের দাবি, বিজেপিকে ভোট দেওয়া মানে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে সমর্থন করা নয়। এটি ছিল তৃণমূলকে ক্ষমতা থেকে সরানোর একটি সাময়িক কৌশল, যা ‘এবার রাম, পরে বাম’ স্লোগানে পরিচিতি পায়।

২০২৬ সালের নির্বাচনে বিজেপি ২৯৪ আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে। যাদবপুর, উত্তরপাড়া, দমদম, দমদম উত্তর ও আসানসোলের মতো বাম প্রভাবিত আসনগুলোও বিজেপির দখলে গেছে। মীনাক্ষী মুখার্জি ও দীপ্সিতা ধরের মতো তরুণ বাম নেতারাও পরাজিত হয়েছেন।

তবে বামেদের জন্য কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। ২০২১ সালে তাদের ভোটের হার ছিল ৫ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৬ সালে বেড়ে প্রায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ তাদের মূল সমর্থকভিত্তি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।

এ ছাড়া মুসলিম ভোট বিভাজনের সুযোগে মুর্শিদাবাদের ডোমকল আসনে জয় পেয়েছে সিপিআই (এম)। বামপন্থী নওশাদ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টও ভাঙড় আসনটি তৃণমূলের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে।

তৃণমূল সরকারের পতনের পর বিভিন্ন এলাকায় বাম দলগুলোর কার্যালয় পুনরুদ্ধারের খবরও সামনে আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বা তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণে থাকা সিপিআই (এম) ও ফরওয়ার্ড ব্লকের একাধিক কার্যালয় আবার বাম কর্মীদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও স্থানীয় বিজেপি নেতারাও এ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেছেন। কোচবিহারের দিনহাটায় ফরওয়ার্ড ব্লকের কার্যালয় উদ্বোধনে বিজেপি নেত্রী পিয়ালী গুপ্তার উপস্থিতি তা আরও স্পষ্ট করেছে।

তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বামেদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠন করা। তৃণমূলের পতনের পর তৈরি হওয়া বিরোধী শূন্যতা পূরণ করতে না পারলে এবং সাময়িকভাবে বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়া ভোটারদের ফেরাতে ব্যর্থ হলে বাংলার রাজনীতিতে বামপন্থীদের সংকট আরও গভীর হতে পারে।

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

শিরোনাম:
সদ্য. রাকসু জিএস আম্মারসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের সদ্য. লতিফ সিদ্দিকীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ ট্রাইব্যুনালের সদ্য. মানবপাচার ও অনলাইন স্ক্যাম প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সদ্য. সন্তানের নামে সম্পত্তি লিখে দিলেও ভোগ করতে পারবেন বাবা-মা: আইনমন্ত্রী সদ্য. এনসিপির কর্মসূচি ঘিরে সিলেটে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন সদ্য. আত্মসমর্পণের আগেই গ্রেপ্তার হতে পারেন শেখ হাসিনা: আইনমন্ত্রী সদ্য. মৌলভীবাজার থেকে সিলেটের পথে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা সদ্য. মিরপুর কলেজের দেয়াল ধস: টিসিবির নামে ভুল সংবাদ প্রকাশ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সদ্য. সাকিব আল হাসানকে টপকে এখন শীর্ষে পরীমনি সদ্য. ছাত্রলীগকে গুপ্ত থেকে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে বললেন প্রক্টর সদ্য. রাকসু জিএস আম্মারসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের সদ্য. লতিফ সিদ্দিকীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ ট্রাইব্যুনালের সদ্য. মানবপাচার ও অনলাইন স্ক্যাম প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সদ্য. সন্তানের নামে সম্পত্তি লিখে দিলেও ভোগ করতে পারবেন বাবা-মা: আইনমন্ত্রী সদ্য. এনসিপির কর্মসূচি ঘিরে সিলেটে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন সদ্য. আত্মসমর্পণের আগেই গ্রেপ্তার হতে পারেন শেখ হাসিনা: আইনমন্ত্রী সদ্য. মৌলভীবাজার থেকে সিলেটের পথে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা সদ্য. মিরপুর কলেজের দেয়াল ধস: টিসিবির নামে ভুল সংবাদ প্রকাশ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সদ্য. সাকিব আল হাসানকে টপকে এখন শীর্ষে পরীমনি সদ্য. ছাত্রলীগকে গুপ্ত থেকে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে বললেন প্রক্টর