বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে ২০২৫ সাল। সামনে অপেক্ষা করছে নতুন বছর—২০২৬। দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এই নতুন বছরের আগে ফিরে তাকালে দেখা যায়, বিদায়ী বছরটি ছিল বিষাদে ভরা। রাজনীতি, শিক্ষা, সমাজ ও সংস্কৃতি অঙ্গনে দেশ হারিয়েছে বহু চেনামুখ ও বিশিষ্টজনকে। নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্মরণীয় অবদান রেখে তাঁরা সবাই চিরবিদায় নিয়েছেন।
বছরের শেষ প্রান্তে এসে সবচেয়ে শোকাবহ খবরটি আসে বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। বছর শেষ হওয়ার একদিন আগে আজ মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকালে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁর মৃত্যুতে আগামীকাল বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) দুপুর ২টায় জাতীয় সংসদ ভবন মাঠ ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে আনুমানিক বিকেল সাড়ে ৩টায় শেরেবাংলা নগরে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে। তাঁর মৃত্যুতে আগামীকাল থেকে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি জানাজার দিন সাধারণ ছুটিও ঘোষণা করা হয়েছে।
চলতি মাসের ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। তিনি ঢাকা–৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টনের কালভার্ট রোডে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় যাওয়ার সময় দুর্বৃত্তদের গুলিতে তিনি আহত হন। প্রথমে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং পরে অবস্থার অবনতি হলে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ১৫ ডিসেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়।
শুধু বেগম খালেদা জিয়া ও শরিফ ওসমান হাদিই নন—বিদায়ী বছরে চিরবিদায় নিয়েছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, রবীন্দ্রগবেষক ও সংগীতজ্ঞ সন্জীদা খাতুন, খ্যাতিমান অভিনেতা প্রবীর মিত্র, প্রখ্যাত চিত্রনায়িকা ও নৃত্যশিল্পী অঞ্জনা রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, লোকসংগীতের বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীন, লেখক–গবেষক ও বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমরসহ আরও অনেকে।
বিদায়ী বছরের শুরুতেই ৪ জানুয়ারি না–ফেরার দেশে পাড়ি জমান ঢাকাই সিনেমার দাপুটে অভিনেত্রী অঞ্জনা রহমান। প্রায় তিন সপ্তাহ অসুস্থ থাকার পর চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে ‘দস্যু বনহুর’ খ্যাত এই নায়িকা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৮ বছর।
এর পরদিন ৫ জানুয়ারি রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান খ্যাতিমান অভিনেতা প্রবীর মিত্র। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৮১ বছর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন।
১৩ মার্চ রাতে মস্তিষ্কে স্ট্রোক ও রক্তক্ষরণজনিত কারণে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। মৃত্যুর আগে কয়েক দিন তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।
২৫ মার্চ রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে মারা যান ছায়ানটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, বিশিষ্ট সংস্কৃতিকজন, রবীন্দ্রগবেষক ও সংগীতজ্ঞ সন্জীদা খাতুন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।
৭ সেপ্টেম্বর লেখক, গবেষক, রাজনীতিক ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর।
১৩ সেপ্টেম্বর দেশের সংগীতাঙ্গন হারায় কিংবদন্তি লালনসংগীত শিল্পী ফরিদা পারভীনকে। দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন এই নন্দিত গায়িকা। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি না–ফেরার দেশে চলে যান। ১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া ফরিদা পারভীন সংগীতজগতে কাটিয়েছেন প্রায় ৫৫ বছর।
১০ অক্টোবর রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। এর আগে ৩ অক্টোবর ধানমন্ডিতে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশে যাওয়ার পথে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসকেরা জানান, তিনি ‘ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক’-এ আক্রান্ত হয়েছিলেন।