বিভিন্ন বাহিনীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা সব অপরাধীকে শনাক্ত করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। রোববার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, গুম, খুন, নির্যাতন, দুর্নীতি ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত হয়ে যারা বিভিন্ন বাহিনীর ভেতরে আত্মগোপনে রয়েছে, তাদের সবাইকে শনাক্ত করা হবে। তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রকৃত দায়ীদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। তিনি দাবি করেন, খুনি হাসিনাকে উৎখাত করার পর এসব অপরাধীকে গ্রেপ্তার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সারা দেশে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হলেও সুপিরিয়র কমান্ডের অনাগ্রহের কারণে তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু হলেও অপরাধী শনাক্ত, অস্ত্র উদ্ধার কিংবা গ্রেপ্তারের মতো কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ফ্যাসিস্ট শাসনামলে সংঘটিত গুম, খুন, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা ও হামলার বিচার হবে উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, টানা ১৫ বছর খুনি হাসিনা গুম, হত্যা, বিনা বিচারে কারাবন্দী, হামলা, নির্যাতন ও মিথ্যা মামলা দিতে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করেছে। এতে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগসহ তাদের সব অঙ্গসংগঠন, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআইসহ বিভিন্ন সরকারি বাহিনী ও সংস্থাকে সক্রিয়ভাবে কাজে লাগানো হয়েছে। জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীসহ রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান এই অপকর্মে ব্যবহৃত হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান বা জুলাই বিপ্লব সম্পন্ন হওয়ার পর এই কাঠামো ভেঙে পড়েছে। নেতৃত্বদানকারী অনেকেই পালিয়েছে, কেউ কেউ বিচারের আওতায় এসেছে, আবার অনেককে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। বহু সামরিক ও বেসামরিক আমলা এবং বিচারক এখনো কর্মরত আছেন। জুডিশিয়ারি, সিভিল সার্ভিস ও পুলিশের শীর্ষ নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়লেও ডিফেন্স সার্ভিস এখনো অটুট রয়েছে। তবে সেনানিবাসে হাজার হাজার খুনি ও লুটেরার আশ্রয় নেওয়া, সেখান থেকে নিরাপদে দেশ ছাড়ার সুযোগ পাওয়া, কিছু জেনারেলের কর্মস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং অবসরপ্রাপ্তদের বিদেশে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনায় সশস্ত্র বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
নাহিদ ইসলাম জানান, গুমবিষয়ক কমিশন এক হাজার ৮৫০টির বেশি অভিযোগ নিয়ে কাজ করেছে। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসররা তথ্য ও আলামত নষ্ট করে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা অসহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষায়, এনসিপির লড়াই হবে ‘নিপীড়নের ব্যবস্থা’ ও ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ সমূলে উৎপাটনের।
ব্যাংক ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে লোপাট হওয়া অর্থ উদ্ধারের অঙ্গীকার করে নাহিদ বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে প্রণীত শ্বেতপত্রের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, হাসিনা ও তার মদদপুষ্ট ব্যবসায়ী ও আমলারা এই অর্থ পাচার করেছে, যা দেশের অর্থনীতিতে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছে। অন্তর্বর্তী সরকার এই অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নিলেও অবহেলা ও অজ্ঞতার কারণে এখন পর্যন্ত কোনো সাফল্য আসেনি বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, দেশবাসী যদি এনসিপিকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেয়, তবে ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে লুটপাট ও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়মুক্তি দেওয়া হবে না এবং ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, সুবিধাভোগী আমলা ও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের বিচারের আওতায় আনা হবে।
বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ পুনর্গঠন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে সমান সংখ্যক নারী ও পুরুষ নিয়োগ, ন্যায্য বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, শাসনব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ, সব ধর্ম ও জাতিগত গোষ্ঠীর সমান নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অগ্রাধিকার এবং নারী প্রশ্নে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন।
শেষে দখলমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে এনসিপির ১১ দলীয় ঐক্যজোটকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।