ভেনেজুয়েলায় হামলার পর থেকেই একাধিক দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের হুমকি নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে। একই ধরনের চাপ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানকেও ঘিরে ছিল। দেশটিতে চলমান বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে সেই আশঙ্কা আরও তীব্র হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—যুক্তরাষ্ট্র কি এবার ‘ভেনেজুয়েলা কৌশল’ অনুসরণ করে ইরানে আগ্রাসন চালাতে পারে? তবে বিশ্লেষকদের মতে, এমন সম্ভাবনা কার্যত নেই। তাদের ভাষ্য, তেহরান কোনোভাবেই কারাকাস নয়। সামরিক শক্তি, আন্তর্জাতিক মিত্রতা ও পারমাণবিক সক্ষমতাসহ একাধিক কারণে ইরানের অবস্থান ভেনেজুয়েলার তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। আল-জাজিরার এক বিশ্লেষণে এসব দিক তুলে ধরা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান সম্ভব হয়েছিল দেশটির দুর্বল প্রতিরক্ষা কাঠামোর কারণে। কারাকাসে অভিযানের আগে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ প্রায় ছয় মাস ধরে প্রস্তুতি নেয় এবং মাদুরোর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের সহায়তা পায়। ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনীর ভেতরের বিশৃঙ্খলা এবং রাশিয়া ও চীনের মতো মিত্রদের কার্যকর সমর্থন না থাকাও অভিযানের পথ সহজ করে দেয়।
এর বিপরীতে ইরানের রয়েছে অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ ও সুসংগঠিত সামরিক বাহিনী। সক্রিয় ও রিজার্ভ মিলিয়ে দেশটির সেনাসদস্য সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। শুধু ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরেই অন্তত দেড় লাখ সদস্য রয়েছে, যাদের অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে অভিজ্ঞ। এর বাইরে বসিজ মিলিশিয়ার নিয়মিত ও রিজার্ভ সদস্য মিলিয়ে সংখ্যা কয়েক লাখ। আধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, দীর্ঘপাল্লার ড্রোন, শক্তিশালী নৌবাহিনী ও অভিজ্ঞ স্থলবাহিনী ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে আরও জোরদার করেছে।
কৌশলগত দিক থেকেও ইরানের অবস্থান ভেনেজুয়েলার চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেল পরিবহণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে হয়ে থাকে। ইরান চাইলে এই প্রণালী আংশিক বা পুরোপুরি অচল করে দিতে পারে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে মারাত্মক সংকট সৃষ্টি করবে। ভেনেজুয়েলার এমন কোনো ভূ-কৌশলগত প্রভাব ছিল না।
আঞ্চলিক পর্যায়েও ইরানের শক্তিশালী মিত্র নেটওয়ার্ক রয়েছে। লেবানন, ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনে ইরানের সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হয়। হিজবুল্লাহসহ একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী ইরান-সমর্থিত হিসেবে পরিচিত। ফলে ইরানে হামলা মানে একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর গভীর উদ্বেগ রয়েছে। ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্রধারী না হলেও তার সক্ষমতা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ওয়াশিংটন। এ কারণে সরাসরি সামরিক সংঘাতে যাওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিধা থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
এ ছাড়া ইরানের সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। ইরানে সরাসরি হামলা এই দুই শক্তিধর দেশের সঙ্গে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যা ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে ছিল না।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এমন যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ইরানে সংঘাত শুরু হলে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিও তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যুদ্ধবিরোধী জনমত আরও জোরালো হতে পারে, যা রাজনৈতিকভাবে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।